ভাসানচর: আমূল বদলে যাওয়া এক দ্বীপের গল্প!

Posted by

ভাসানচর‘ বঙ্গোপসাগরের বুকে গজিয়ে ওঠা দ্বীপ বা চর। ওই অঞ্চলে নবগঠিত যেসব চর রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। 

ভাসানচর

বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার চর ঈশ্বর ইউনিয়ন এর অন্তর্গত মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নবগঠিত ছোট্ট দ্বীপ ভাসানচর।

এই দ্বীপ বা চরের বয়স মাত্র ২০ বছর।

রোহিঙ্গা সংকট শুরুর কয়েক মাস পর থেকেই এই জায়গাটি আলোচনায় চলে আসে। স্থানীয়রা দ্বীপের নাম নিয়ে দুই অংশে বিভক্ত ছিল।

নাম নিয়ে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ঠেঙ্গারচর’ বা ‘জালিয়ারচর’ এর নাম বদলে ‘ভাসানচর’ হিসেবে ঘোষণা দেন।

নোয়াখালী জেলার বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ভাসানচরের মোট আয়তন ১৬ হাজার একর।

এর মধ্যে জালিয়ারচরের আয়তন ছয় হাজার একর ও ঠেঙ্গারচরের আয়তন ১০ হাজার একর।

চর দুটির অবস্থান পাশাপাশি হওয়ায় নাম নিয়ে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, জালিয়ারচর ঠেঙ্গারচর নয়। ঠেঙ্গারচরও জালিয়ারচর নয়। দুটি ভিন্ন ভিন্ন চর। যার নতুন নামকরণ হয়েছে ‘ভাসানচর’।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নোয়াখালী জেলা সদর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার ও উপকূলীয় সুবর্ণচর উপজেলা হতে প্রায় ৫০ কিলোমিটার, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার পশ্চিম প্রান্ত থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং হাতিয়া উপজেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার পূর্বদিকে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় প্রায় ২০ বছর আগে জেগে ওঠে বিচ্ছিন্ন ও জনমানবশূন্য ভাসানচর।

একসময় এটি বনদস্যু ও জলদস্যুদের অভয়ারণ্য ছিল।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু করার পর থেকে বনদস্যু ও জলদস্যুরা আস্তে আস্তে ওই চর থেকে সরে যায়।

একইরকম ভবন

ভাসানচর

বাংলাদেশ নৌবাহিনী গত তিন বছরে ভাসানচরের চেহারা আমূল বদলে দিয়েছে ।

কক্সবাজার থেকে এক লক্ষ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে সরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে এক প্রকল্প গ্রহণ করে বাংলাদেশ সরকার।

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে মোটামুটি ১৬ হাজার একর আয়তনের ওই ভাসানচরে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করে এক লাখের বেশি মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এখানে রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য সব মিলিয়ে ১,৪৪০টি একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রতিটি ঘরে রয়েছে ১৬টি কক্ষ – সামনে ৮টি এবং পেছনের দিকে আরও ৮টি।

১২x১৪ ফুটের একেকটি ঘরে একটি পরিবারের অন্তত চার জন সদস্যকে থাকতে হবে।

রান্নার জন্য প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি করে চুলার জায়গা বরাদ্দ করা আছে।

আর প্রতি ৮টি কক্ষের জন্য তিনটি টয়লেট এবং দু’টি গোসলখানা রয়েছে।

রান্নাঘর, গোসলখানা এবং টয়লেটে পানির সরবরাহ রয়েছে।  এর পাশাপাশি প্রতিটি ক্লাস্টারে একটি করে পুকুর রয়েছে।

এসব পুকুরের গভীরতা ১০ ফুট। এসব পুকুরে পানি গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করা যাবে।

এছাড়া, ঘূর্ণিঝড়ের সময় ব্যবহারের জন্য ১২০টি চারতলা আশ্রয়কেন্দ্রও নির্মাণ করা হয়েছে৷

প্রতিটি ক্লাস্টার একই আদলে নির্মাণ করা হয়েছে। সব ঘর দেখতে একই রকম। প্রতিটি ঘরের সামনে বেশ চওড়া রাস্তা রয়েছে।

এসব রাস্তার প্রশস্ততা ২০ থেকে ২৫ ফুট। বাংলাদেশের কোন গ্রামে সাধারণত এই ধরণের রাস্তা দেখা যায় না।

মসরুর জুনাইদ-এর ব্লগে আরও পড়ুন- 

অন্যদিকে, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচর দ্বীপকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে।

এই দ্বীপ বা চরে রয়েছে সমস্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, বছরব্যাপী মিঠাপানি, সুন্দর হ্রদ, অবকাঠামো এবং উন্নত সুবিধা।

বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, কৃষি জমি, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, দুটি হাসপাতাল, চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, টেলিযোগাযোগ পরিষেবা, বিনোদন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, খেলার মাঠ রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য স্যানিটেশন এবং চিকিৎসা সুবিধার পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।

মহিলা পুলিশ সদস্যসহ পুলিশ মোতায়েন করে দ্বীপে পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।

ভাসানচর এলাকা পুরোপুরি সিসিটিভি ক্যামেরায় আচ্ছাদিত বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এছাড়া, খাদ্য মজুদের জন্য এখানে সুবিশাল গোডাউন নির্মাণ করা হয়েছে ভাসান চরে।

রয়েছে ৪টি সুরক্ষিত ওয়্যারহাউস (খাদ্যগুদাম)। এসব গুদামে ১ লাখ মানুষের ৩ মাসের খাবার মজুদ রাখা যাবে।

ভাসানচর এ নতুন জীবন

পুকুর

সারি সারি লাল ছাউনির ঘরগুলোতে ওঠার সময় আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ সংশয় পিছনে ফেলে ভাসানচরে পৌঁছা রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটির চোখেমুখে দেখা গেল নতুন ঠিকানা পাওয়ার আনন্দ

উল্লেখ, রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটি শুক্রবার ( ৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ) দুপুরের পর নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরে পৌঁছেছে।

বেলা সোয়া ২টার দিকে রোহিঙ্গা দলটি ভাসানচরে পা রাখে। দলটিতে নারী-পুরুষ ও শিশু মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গা রয়েছে।

এর আগে ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য রোহিঙ্গাদের এই দলটিকে বুধবার রাতে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প সংলগ্ন ঘুমধুম ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের বহনকারী ৩৯টি বাস উখিয়া কলেজের মাঠ থেকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিএএফ শাহীন কলেজ মাঠ ও বোট ক্লাব এবং এর আশপাশের এলাকায় অস্থায়ী ট্রানজিট শিবিরে আনা হয়।

সেখান থেকে শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে তাদের বোট ক্লাব, আরআরবি জেটি ও কোস্ট গার্ডের জেটি থেকে নৌবাহিনী ছয়টি এবং সেনাবাহিনীর একটি জাহাজে করে রোহিঙ্গারা ভাসানচরের উদ্দেশে যাত্রা করে।

জাহাজে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার এই যাত্রাপথে দুপুরের খাবারে ছিল মোরগ পোলাও।

জাহাজ ছাড়ার পর উৎসুক রোহিঙ্গারা চারদিক দেখতে থাকেন আগ্রহ নিয়ে। তাদের অনেকেই সাম্পানে বা অথবা ভেলায় চেপে নাফ নদী আর সাগর পাড়ি দিয়ে ২০১৭ সালের অগাস্টের পর কক্সবাজারে পৌঁছেছিলেন।

প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গেই দেখা গেল ব্শে কয়েকজন করে শিশু।

জাহাজের ডেকে খেলায় মেতে ওঠা এই শিশুদের সামলাতে রীতিমত হিমশিম খেতে হয় বাবা-মায়েদের।

ভাসানচরসুত্র জানায়, শুক্রবার যে ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গা ভাসানচরে এসেছেন, তাদের জন্য ৭, ৮, ৯ ও ১০ নম্বর ক্লাস্টারের ৪৮টি হাউজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের অতিরিক্ত শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ শাসসু-দ্দৌজা বলেন, আপাতত ২২টি এনজিওর মাধ্যমে এই রোহিঙ্গাদের খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো হবে।

প্রথম সাতদিন তাদের রান্না করা খাবার খাওয়ানো হবে।

নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্প এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে করা হয়েছে হাঁস, মুরগি, কবুতর, মাছ এবং ফল ও ফসলের খামার।

স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর জন্য দুগ্ধ খামার, ধান ও সবজি চাষ, হস্তশিল্প, নারীদের জন্য সেলাইয়ের কাজ এবং পর্যটনের প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তের আলোকে চার তলাবিশিষ্ট দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।

জ্বালানি সরবরাহে ২৫০ টন ধারণক্ষমতার ২টি ফুয়েল ট্যাংক নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।

প্রসঙ্গত,  মালয়েশিয়া যেতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা তিন শতাধিক রোহিঙ্গাকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে আগেই ভাসানচরে নিয়ে রাখা হয়েছিল। এরপর গত ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দলকে দেখার জন্য ভাসান চরে পাঠানো হয়।

  • সবাই পেলেন ঘর

ওয়্যার হাউসে দোয়া অনুষ্ঠানের পর রোহিঙ্গা নেতাদের মাধ্যমে নির্ধারিত নিজ নিজ ঘরে যায় রোহিঙ্গারা। এ সময় দেখা যায় উৎসবের আবহ। রোহিঙ্গাদের হাঁকডাক ও সারি বেঁধে ঘরে যাওয়ার সময় মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ।

পাকা দালানে ঘর, বিছানা পেয়ে রোহিঙ্গা শিশুদের আনন্দ করতে দেখা যায়।

কক্সবাজারের ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের খুপড়ি ঘরগুলোতে বিদ্যুতের সরবরাহ না থাকলেও ভাসানচরে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

  • ভাসানচরে আলিশান বাড়ি

আলিশান বাড়িভাসানচরে ঢুকে কিছুদূর অগ্রসর হলেই একটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ি সবার চোখে পড়বে। এই বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের জন্য।

তারা যখন ভাসানচর পরিদর্শনে আসবেন, তখন ওই বাড়িতে বিশ্রাম নিতে পারবেন। এখানে প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির জন্য আলাদা কক্ষ রয়েছে।

সূত্র জানায়, এখানে নৌবাহিনী প্রধানের নিচে কেউ থাকতে পারবে না।

  • যোগাযোগ ব্যবস্থা

বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভাসান চর। মাছধরার নৌকায় করে হাতিয়া থেকে এই চরে পৌঁছতে সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা।

চরটির সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ সহজ করতে পল্টুন স্থাপন করা হয়েছে।

আছে হেলিকপ্টার অবতরণে হেলিপ্যাড।  তবে, ভাসান চরে যেতে সাধারণ মানুষের উপযোগী কোনো বাহন নেই।

  • ফোরজি নেটওয়ার্ক

সরকারি কোম্পানি টেলিটকসহ ইতোমধ্যে তিনটি মোবাইল ফোন কোম্পানির ফোরজি নেটওয়ার্ক রয়েছে এ চরে। এছাড়া সবকটি মোবাইল কোম্পানির নেটওয়ার্কও পাওয়া যায়।

ঝড় – জলোচ্ছ্বাসে কী হবে?

ভাসানচরভাসানচরে নির্মিত ঘরগুলো কক্সবাজারে অবস্থিত শরনার্থী ক্যাম্পগুলোর তুলনায় অনেক ভালো। কিন্তু ভাসান চর নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে, বড় ধরণের ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের সময় এই চরের কী অবস্থা হবে?

শুরুর দিকেও পশ্চিমা কিছু বেসরকারি সংস্থার অভিযোগ ছিল,  এটি নিচু দ্বীপ। এটি ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক কমোডোর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী গনমাধ্যমকে জানান, গত ১৭১ বছরের ঘূর্ণিঝড় পর্যালোচনা করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোন ঘূর্ণিঝড়ের আই (কেন্দ্র) এই এলাকার উপর দিয়ে যায়নি।

জলোচ্ছ্বাস থেকে এলাকাটিকে রক্ষায় বাঁধের উচ্চতা ঠিক করা হয়েছে ১৭৬ বছরের সাইক্লোনের তথ্য পর্যালোচনা করে।

একই সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বঙ্গোপসাগরের ১০ হাজার বছরের সাইক্লোনের সিনথেটিক ডাটাকে।

ভাসান চর আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পরামর্শ নিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইচআর ওলিংফোর্ডের।

সমীক্ষা অনুযায়ী, এ পর্যন্ত কোনো ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র ভাসান চর অতিক্রম করেনি।  এ চরের সবচেয়ে কাছ দিয়ে একটি ঘূর্ণিঝড় অতিক্রম করেছিল ১৯৯৭ সালে। তা ভাসান চর থেকে ৩৬ নটিক্যাল মাইল (৬৬.৭ কিলোমিটার) দূরে ছিল।

বিভিন্ন সময় বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা হলেও ভাসানচরের ভেতরে পানি জমেনি।

১৮টি স্লুইসগেটের মাধ্যমে ভাসানচর থেকে পানি নিস্কাশন করা হয়েছে।

কমোডোর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী আরও  জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যাতে ব্যবহার করা যায়, সেই লক্ষ্য নিয়ে ভাসানচরে পাঁচ তলা বিশিষ্ট ১২০টি শেল্টার হাউজ নির্মাণ করা হয়েছে।

এসব শেল্টারহোম ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাতাসের মধ্যেও টিকে থাকবে।

জোয়ার এবং জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে ভাসান চরকে রক্ষার জন্য চারপাশে নয় ফুট উচ্চতার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

এছাড়া, সমুদ্রের যে পাশ থেকে ঢেউ চরে আঘাত করে, সেই পাশেই শোর প্রোটেকশন দেয়া হয়েছে।

শোর প্রোটেকশন থেকে ৫০০ মিটার ভেতরে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই বাঁধ ১৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু করা হবে।

রোহিঙ্গা স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত আছে, যুক্ত নেই বলে জাতিসংঘের বিবৃতি

এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পর্কে জাতিসংঘের কাছে তথ্যও খুবই কম আছে জানিয়ে জাতিসংঘ আবাসিক সমন্বয়কারীর কার্যালয় থেকে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী দিনে কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভাসানচরে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে জাতিসংঘ অবগত আছে।

কিন্তু শরণার্থীদের স্থানান্তর প্রস্তুতি কিংবা রোহিঙ্গাদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংস্থাটিকে যুক্ত করা হয়নি।

বুধবার জাতিসংঘ তাদের বিবৃতিতে বলছে, ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের ব্যাপারে জাতিসংঘ তার আগেকার অবস্থানেই রয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সরকার অনুমোদন দিলে, জাতিসংঘ প্রায়োগিক এবং সুরক্ষা বিষয়ক মূল্যায়ন করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

রোহিঙ্গা স্থানান্তরকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা না করার আহ্বান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের

ভাসানচরশুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ভাসানচর-এ স্থানান্তর নিয়ে সরকারের প্রচেষ্টাকে দুর্বল বা ভুলভাবে ব্যাখ্যা না করতে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এবং ভূমিধসসহ যেকোনো ঝুঁকি এড়াতে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর অপরিহার্য হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং তাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফিরে যেতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার অস্থায়ীভাবে আশ্রয়প্রাপ্ত মিয়ানমার নাগরিকদের আশ্রয় ও নিরাপত্তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।

রোহিঙ্গাদের অধিকার, দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্যও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের সাথে প্রত্যাবাসন শুরু করার কাজে জড়িত, যা এই সঙ্কটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান।

মসরুর জুনাইদ-এর ব্লগে আরও পড়ুন- 

কক্সবাজার ক্যাম্পগুলোতে নানান ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ সরকার পর্যায়ক্রমে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসান চরে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রাণের উৎসব

নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটি নতুন ঠিকানায় এসে পৌঁছেছে শুক্রবার দুপুরে।

নতুন ঠিকানায় তাদের স্বাগত জানাতে ভাসান চরের অস্থায়ী আবাসস্থলটি বর্ণিল ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়।

রোহিঙ্গাদের আগমনে আশ্রয় শিবিরজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। স্বেচ্ছায় ভাসানচরে আসা রোহিঙ্গারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

রোহিঙ্গাদের একজন সৈয়দ উল্লাহ শুক্রবার ভাসানচরে পৌঁছে সেখানকার সব সুযোগ-সুবিধাগুলো দেখে খুব খুশি হয়েছেন।

তিনি ফোনে বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। আমরা অত্যন্ত খুশি। আমি কখনই ভাবিনি যে এত সুন্দর জায়গাটি, এত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’

পরবর্তী যাত্রায় ভাসানচর-এ আসার জন্য কক্সবাজার ক্যাম্পে থাকা তার স্বজনদের উৎসাহিত করেছেন সৈয়দ উল্লাহ।

তিনি আরও বলেন, ‘কেউ আমাদের এখানে আসতে বাধ্য করেনি। আমি স্বেচ্ছায় এখানে এসেছি। এখানকার সুযোগগুলো দেখার পরে সবাই এখানে আসতে রাজি হবে।’

আমরা যা ভেবেছি তার থেকে বেশি পেয়ে আমরা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি; বলেন তিনি।

এদিকে, বসবাসের জন্য নতুন ঘর ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ পেয়ে আনন্দিত স্বেচ্ছায় ভাসানচরে আসা রোহিঙ্গারা। কক্সবাজারের বদ্ধজীবনে হাঁপিয়ে ওঠা শিশুরা উন্মুক্ত পরিবেশ পেয়ে আনন্দে আত্মহারা।

ভাসানচর-এ  প্রথম রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম

রোহিঙ্গা শিশুর জন্মশুক্রবার ১১ ডিসেম্বর ২০২০ ভাসানচরে জন্ম নিলো প্রথম রোহিঙ্গা শিশু। এই চরে আশ্রয় নেওয়া আট দিনের মাথায় মো. কাশেম ও রাবেয়া খাতুনের ঘরে এলো তৃতীয় সন্তান।

কাশেম ও রাবেয়ার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয় কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পে। তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম হয় মিয়ানমারে।

মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৭ সালে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন কাশেম ও রাবেয়া দম্পতি কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা ছিলেন। গত ৪ ডিসেম্বর তাদের নোয়াখালীর ভাসানচরে নেওয়া হয়।

 দ্বিতীয় ধাপে ভাসানচরে গেল ১ হাজার ৮০৪ রোহিঙ্গা

দ্বিতীয় ধাপে ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর ( মঙ্গলবার ) নৌ-বাহিনীর ছয়টি জাহাজে করে ভাসানচরে গেল ১ হাজার ৮শত ৪ জন রোহিঙ্গা।

তথ্যসূত্র : পত্রিকা, আর্টিকেল, ওয়েব, ব্লগ থেকে সংগৃহীত ও সম্পাদিত।

মতামত দিন